“এতো বড়ো পেট আর এই গেল নিয়ে অভিনেতা হওয়া যায় নাকি!”, জীবনের অজানা কাহিনী নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেতা বিশ্বনাথ বসু

নিজস্ব প্রতিবেদন: জনপ্রিয় অভিনেতা বিশ্বনাথ বসুকে চেনেন না পশ্চিমবঙ্গে এমন অভিনেতা হয়তো কমই রয়েছেন। শহর থেকে গ্রামাঞ্চল, রাজ্য পেরিয়ে দেশ, আবার দেশের সীমানা অতিক্রম করে পৃথিবীর যে সমস্ত প্রান্তে বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ রয়েছেন, এখানেই নিজের অভিনয় দক্ষতার জোরে জায়গা করে নিয়েছেন এই অভিনেতা। তবে অভিনেতা হিসেবে জায়গা তৈরি করতে নিজের জীবনে বিশ্বনাথ বসুকে কম লড়াই করতে হয়নি। বসিরহাটের আড়বেলিয়া গ্রাম থেকে শহরে এসে দিনের পর দিন পরিচালক, প্রযোজকদের দরজায় ঘুরতে হয়েছে তাকে।

তার চেহারা নিয়েও বহু মানুষ কটাক্ষ করেছেন। এমনকি অনেকেই তাকে ‘বিশ্বনাথ’ নামটাও বদলে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন তিনি পারবেন, তাই হার মেনে নেননি। ঠিক এই কারণের জন্যই আজ তিনি ১৫০ টি সিনেমা আর ১০০টা ধারাবাহিকের জনপ্রিয় অভিনেতা। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে উঠে এসেছে তার একটি সাক্ষাৎকার। জোশ টকস ইউটিউব চ্যানেলের তরফ থেকে এই ভিডিওটি শেয়ার করে নেওয়া হয়েছে। সেই সাক্ষাৎকার থেকেই কিছু অংশ আমরা আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরতে চলেছি। কেমন লাগলো তা জানাতে অবশ্যই ভুলবেন না।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই বিশ্বনাথ বসু জানান, “আমি বড় হয়েছি বসিরহাটের আড়বেলিয়া গ্রামে, যদিও আমার জন্ম বর্ধমানে। ১৯৮৮ সাল থেকে আমি নিয়মিত টেলিভিশনের দর্শক ছিলাম। রবিবারে যখন সেখানে বাংলা সিনেমা দেখানো হতো বাবা খুব হাসতেন। ছোটবেলা থেকেই আমার কমেডির প্রতি একটা ভীষণ নজর ছিল। বাড়িতে সেন্স অফ হিউমার বা প্রত্যেকের মধ্যেই একটা রসবোধের চর্চা ছিল। এই সময় একদিন সিনেমা দেখতে দেখতে আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাকে যদি কেউ নিতে চায় তুমি কি দেবে?

ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল মিঠুন চক্রবর্তী। তিনি যদি এত কষ্টের মধ্যে বোম্বের মতন জায়গায় নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন তাহলে আমি কেন পারব না? কিন্তু ক্লাস নাইনের পর থেকে আমি বুঝতে পারলাম গ্রামের আর পাঁচটা ছেলে থেকে আমি অন্যরকম। ছোটবেলা থেকেই আমি দুটো জিনিসকে অস্ত্র করেছিলাম এক হল কুমার শানুর গান, অন্যটি হলো মিঠুন চক্রবর্তীর অভিনয়।

রাজারহাট অথবা উত্তর ২৪ পরগনায় এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে নাটক করিনি। এরপর আমি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে আমার ভাইয়ের মাধ্যমে দেখা করি যিনি আমার জীবন বদলে দিয়েছিলেন। তিনি হলেন কনক রায়।ওনার কাছে যাওয়ার পর আমি বুঝেছিলাম অভিনয় শুধুমাত্র চুল কাটা বা স্টাইলের নাম নয়,এটা একটা বোধ। আমি চেয়েছিলাম রাস্তা দিয়ে গেলে মানুষ আমাকে দেখলে হাসুক, আমার অটোগ্রাফ নিক। আজ আমার সব স্বপ্নই সত্যি হয়েছে”।

সঙ্গে আরো যোগ করে অভিনেতা বলেন, “একবার এক পরিচালক আমাকে আটবার ডেকেছিলেন কিন্তু কখনোই বসতে বলেননি। সেই সময় স্টুডিওর একজন আমায় বলেছিলেন আর যে কষ্টটা তুমি করলে তার ফলাফল তুমি পাবে। প্রত্যেকের জীবনেই আমাদের প্রচুর দুঃখ-কষ্ট লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু সেটাকে জয় করতে হয়। আমি একজন সৌভাগ্যবান মানুষ। টেলিভিশন জগতে অভিনয় করতে আসার পর আমাকে বিভিন্ন কারণ দেখানো হয়েছিল।

প্রথমত, এত বড় পেট নিয়ে অভিনয় করতে পারবো না। কেউ বলল শরীর চর্চা করতে আবার ,কেউ বলল নামটা বদল কর। বিশ্বনাথ আবার কারো নাম হতে পারে নাকি। কিন্তু আমি ভেবে দেখেছিলাম যদি কারোর একবার নাম হয়ে যায় সেটাই মানুষের কাছে সব থেকে বেশি দাম হয়।। কত জায়গাতেই আমি প্রশ্নের মুখে পড়েছি যে তোমাকে আমি কেন নেব? এখনো পর্যন্ত আমার কাজের জায়গাতে স্ট্রাগল কোনদিনও শেষ হয় না। প্রতিদিন যেন নতুন স্ট্রাগল থাকে”।

বিশ্বনাথ বাবুর কথায়, “এনজিওয়ান স্টুডিওতে আমাদের একটা সময় ঢোকা বারণ ছিল। কত বড় বড় ডিরেক্টর, প্রডিউসাররা সেখানে কাজ করেন। প্রভাত রায় থেকে শুরু করে হরনাথ মজুমদারের মতন মানুষেরা সেখানে কাজ করছেন সুতরাং ব্যাঘাত সৃষ্টি হতেই পারে। সেই জন্য আমি প্রতিদিন অপেক্ষা করতাম যে আমার এক বন্ধু বাইকে করে আমাকে স্টুডিওর মধ্যে ঢুকিয়ে দেবে।

কারণ একমাত্র যদি আপনি গাড়ি করে আসেন তবেই স্টুডিওর দরজা খুলবে। স্টুডিওর সামনের বেঞ্চে আমাকে দিনের পর দিন ঢুকে বসে থাকতে হতো। প্রশ্ন করা হতো আমি কেন যাব ভেতরে? কিন্তু বোঝাতে পারতাম না যে আজ সবাই যে কারণে স্টুডিওতে এসেছে আমিও সেই কারণেই ভেতরে যাব। মনে রাখবেন একটা মানুষের জীবনে কখনোই লক্ষ্য ছাড়া কিছু হতে পারে না”।

Back to top button