“আমার প্রথম শাড়ি গলায় জড়িয়ে সুইসাইড করেছিল বাবা!”, জীবনের অজানা ঘটনা এবার ফাঁস করলেন পিয়ালী বসু

নিজস্ব প্রতিবেদন: বাংলা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক প্রযোজকদের কাছে এই মুহূর্তে ভরসার একমাত্র নাম পিয়ালী বসু। ধারাবাহিকের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের জন্য অত্যন্ত নির্ভরশীল পিয়ালী। তবে কেরিয়ারের শুরুর দিকটা কিন্তু মোটেও তার এতটা সুন্দর ছিল না। এক স্টুডিও থেকে আরেক স্টুডিওতে তাকে প্রযোজকদের কাছে ঘুরে ঘুরে কাজ চাইতে হতো। এরপর একদিন অনেকটা আকস্মিক ভাবেই তার কাছে সুযোগ আসে। বহ্নিশিখা ধারাবাহিকে নার্সের চরিত্রে সিলেক্ট হন তিনি।

মাত্র তিন দিনের চরিত্র পেলেও পরবর্তীতে তার অভিনয়ের জোরে 180 দিনের চরিত্রে বদলে যায় এটি। এরপর থেকে আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি কখনো। জীবনের সমস্ত ঘাত প্রতিঘাত আর লড়াই শক্ত হাতেই সামলেছেন পিয়ালী। সম্প্রতি জোশ টকস নামের একটি প্ল্যাটফর্মে নিজের জীবনের লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন পিয়ালী। সেই কিছু দৃশ্য এই ভাইরাল হয়ে উঠে এসেছেন এর মাধ্যমে। আজ আমরা আপনাদের সামনে সেই সাক্ষাৎকার তুলে ধরতে চলেছি।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই পিয়ালী বলেন, “আমার জীবনের শুরুটা একটা বিশাল ধাক্কা দিয়ে হয়। যখন আড়াই বছর বয়স তখন আমার বাপি আমাকে ছেড়ে চলে যায়। এই চলে যাওয়াটা ভীষণ মর্মান্তিক ছিল। একজনের থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন আমার বাপি। ব্যবসা খুব নিম্নমুখী থাকায় সেই পাঁচ হাজার টাকা আর তিনি শোধ দিতে পারেননি। এইজন্য সেই ভদ্রলোক বাপির কলার ধরে রাস্তায় কাদার মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিয়েছিলেন। আমার বাপি খুব সম্মানীয় মানুষ ছিলেন।

এই ঘটনাটা তাকে ভীষণ ভাবে নাড়া দেয় এবং কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি ডিপ্রেশনে চলে যান। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই বাপি সুইসাইড করেন। আমার মামা বাড়ি ছিল অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার। বাপি চলে যাওয়ার পর থেকেই মায়ের একার লড়াই শুরু হয়। আমি খুব লাকি যে এরকম মামা বাড়ি পেয়েছিলাম কারণ মামার বাড়ির সকলে না, থাকলে আমি আজ পিয়ালী বসু হতে পারতাম না।।

আমার মা আমাকে সেলাই স্কুলের টিচারিং করে মানুষ করেছিলেন। এমনকি আমার খিদে পেয়েছে হাফ লিটার দুধ ৩ দিন ধরে জল মিশিয়ে তিনি আমাকে খাইয়েছেন। কারণ পয়সা ছিল না। মায়ের মাসিক পিরিয়ডের দিনগুলোতেও কসবা থেকে গোলপার্ক পর্যন্ত হেঁটে যেতেন আর ওই অবস্থাতেই ফিরে আসতেন। যাতে পরের দিন সেই যাতায়াতের খরচ জমিয়ে রেখে আমাকে স্কুলে ভালো টিফিন দিতে পারেন। আজকে সেই জায়গা থেকে আমি পিয়ালী গোটা পশ্চিমবঙ্গে দাপিয়ে বেড়াতে পারছি”।

সঙ্গে আরো যোগ করে অভিনেত্রী বলেন, “একটা সময় আমি স্থির করে নিয়েছিলাম ডাক্তার হব। কিন্তু এর পরে আমার জীবনটা একটু ঘুরে গেল। আমার বাবারই একজন বন্ধু, যিনি বর্তমানে আমার বাবা তিনি আমার মাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আমাকে দত্তক নিলেন। তারপর থেকে অনেকটাই পরিবর্তন এলো। কিন্তু বাবার ফ্যামিলি ছিলেন একটু অন্যরকম অর্থাৎ তাদের স্ট্রাকচার ছিল একটু অন্যরকম।

সংগীত জগতের সাথে তাদের বিশেষ যোগাযোগ ছিল। আমাকে পাড়ার ফাংশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন নাটক খুব টানতো। আমি বাবাকে লুকিয়ে পাড়ার সরস্বতী পুজোর থিয়েটারে প্র্যাকটিস করতাম। কিন্তু বাবার পরিবারের ওকালতি ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং এর বাইরে খুব একটা কেউ ছিল না। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি অভিনয় করব এটা ওনার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। কিন্তু বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে ডাক্তার হতে পারলাম না আর অভিনয়টাকেই বেছে নিলাম। আমি প্রথমবার এসেছিলাম নিউজ রিডার হিসেবে। কিন্তু কোথাও যেন সমস্ত কিছু খাপছাড়া অবস্থায় থেকে যাচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমি টেলিভিশনে অভিনয় করব”।

পিয়ালী বসুর কথায়, “ছোটখাটো চরিত্রে কাজ করতে করতে একদিন ইটিভির একটা প্রজেক্ট এর সুযোগ পেলাম।এটা ছিল দেবাংশু দার প্রোজেক্ট।যিনি আমার গডফাদার।তার অফিস থেকেই বলা হলো বহ্নিশিখা ধারাবাহীকে সাত দিনের একটা চরিত্র আছে। চরিত্রটি ছিল ইন্দ্রানী হালদার আর রুদ্রনীল ঘোষের বিপরীতে। সেই সাত দিনের মতি চরিত্রটা আমার হয়ে গেল পরবর্তী কালের 180 টা এপিসোড। তখন সবেমাত্র আমার কলেজে পড়াশোনা আমার গ্রাজুয়েশন শুরু হয়েছে।পরপর কাজ করতে শুরু করলাম।

যেহেতু কোন অভিনয় ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না তাই অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেক খারাপ প্রপোজালের মধ্যে দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমি মেন্টালি এতটাই স্ট্রং, প্রথম থেকেই নিজের একটা বাউন্ডারি সেট করে নিয়েছিলাম। আমাকে বরাবর থেকে নিজের প্রটেকশন নিজেকে করতে হতো। অপর একজন সিনিয়র অভিনেতা এবং আমার আরেকজন গডফাদার অনিন্দ্য সরকার আমাকে বলেছিলেন,‘ তুই লম্বা রেসের ঘোড়া অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারবি’। আমার জীবনে বহ্নিশিখার পরে যদি বলতে হয় আরো একটা মাইলস্টোন, সেটা হলো রাখি বন্ধন।

ধারাবাহিকটি আমাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। আপনাদের সাথে আছে নিজেদের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নিলাম যাতে এই কথাগুলো শুনে আপনারাও নিজেদের সাথে লড়াই করে কিছুটা হলে এগোতে পারেন”। সবশেষে এটি বলেই নিজের বক্তব্য শেষ করেন পিয়ালী বসু।গোটা নেট মাধ্যমে বর্তমানে পিয়ালী বসুর এই সাক্ষাৎকার এখন ব্যাপকভাবে ভাইরাল। আজকের এই বিশেষ নিবেদন আপনার কেমন লাগলো তা অবশ্যই জানাতে ভুলবেন না।

Back to top button